হতে চাইলে অ্যাপ কারিগর

বিশ্বে মোবাইল অ্যাপসের বাজার হাজার কোটি ডলারের। উন্মুক্ত হওয়ায় এই বাজারে কাজ করার সুযোগ আছে বাংলাদেশি ডেভেলপারদেরও। তবে থাকতে হবে জানাশোনা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন তুহিন মাহমুদ

আয় ভালো

বড় প্রতিষ্ঠানের জন্যই যে কেবল অ্যাপ তৈরি করা হয়, এমনটি নয়। ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসগুলোতে প্রতিদিনই অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রচুর আবেদন জমা পড়ে। আপওয়ার্কে (সাবেক ইল্যান্স-ওডেস্ক) করা কাজের আবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, একজন ওয়েব ডিজাইনার কিংবা সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজার যেখানে ঘণ্টাপ্রতি গড়ে ১০ থেকে ১২ ডলার কাজ করেন, সেখানে একজন অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপারের ঘণ্টাপ্রতি গড় আয় ২৫ থেকে ৫০ ডলার।

App Developer BD

করতে হলে জানতে হবে

মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করতে হলে জাভা বা অবজেক্টিভ সি, সি++ এবং অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ ও অ্যানালিসিস জানতে হবে। বেছে নিতে হবে প্ল্যাটফর্ম। এ ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় দুটি প্ল্যাটফর্ম হচ্ছে অ্যানড্রয়েড ও আইওএস। অ্যান্ড্রয়েডের প্রোগ্রামিং ভাষা জাভা। যেকোনো প্রোগ্রামিং ভাষা শেখার পর আরো কিছু বিষয় জানতে হবে; যেমন- ভেরিয়েবল, অপারেটর, স্টেটমেন্ট, কন্ডিশন, ইটারেটর, মেমোরি ম্যানেজমেন্ট, অ্যারে ও ফাইল অপারেশন। সবচেয়ে বড় কথা হলো আপনার তৈরি অ্যাপ্লিকেশনটির নকশা। সফটওয়্যারের নকশা প্যাটার্ন প্রত্যেক প্রোগ্রামারের রপ্ত করা উচিত।

অ্যানড্রয়েড ও আইওএস- এ দুটিতেই এমসিভি পদ্ধতিতে কাজ করতে হয়। ইভেন্ট হ্যান্ডলিং ছাড়াও আরো কিছু ব্যাপার আছে, যা অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং, অ্যানালিসিস, ডিজাইন, ডেভেলপমেন্টের কৌশল রপ্ত না করলে বুঝতে অনেক সময় লেগে যেতে পারে।

কোন প্ল্যাটফর্মের অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট শিখতে চান, সেটি আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এরপর গুগল থেকে জেনে নিতে হবে এই প্ল্যাটফর্মে অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টের উপায়। ইন্টারনেট থেকেই অনেক কিছু শেখা সম্ভব। তবে হাতে-কলমে এবং দ্রুত শিখতে ভালো মানের পেশাদার প্রতিষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশে বর্তমানে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান অ্যাপস ডেভেলপমেন্টের ওপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তবে ভর্তি হওয়ার আগেই তাদের সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নেওয়া উচিত।

দেশের সফটওয়্যার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বেসিসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বেসিস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিআইটিএম) ও এমসিসি লিমিটেড এ ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। বিআইটিএমে যোগাযোগ করতে পারেন +৮৮০২৮১৫১১৯৬-৯৭ নম্বরে। ই-মেইলে যোগাযোগের ঠিকানা info@basis.org.bd।

এমসিসিতে যোগাযোগ করতে হবে +৮৮০২৮১২৯১৯ নম্বরে। আর ই-মেইল করতে হবে রহভড়- info@mcc.com.bd।

পথে আছে বাধা

মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপার মাহমুদ হাসান সানি বলেন, অ্যাপ তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবকাঠামোগত অবস্থা এখনো খুবই দুর্বল। প্রথম সমস্যা ইন্টারনেটের গতি। কম গতির কারণে বড় এসডিতে ফাইলগুলো নামাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়। এ ছাড়া অনলাইনে এ-সংক্রান্ত যেসব রিসোর্স রয়েছে, সেগুলোও সহজলভ্য নয়। দ্বিতীয় কারণ মূলধনের অভাব। মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপমেন্টে ক্যারিয়ার গড়তে একজন ডেভেলপারকে ভালো কনফিগারেশনের কম্পিউটার কিনতে হয়। আর সেটি যদি অ্যাপলভিত্তিক অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট হয়, তাহলে তাঁর খরচ বেড়ে আকাশচুম্বী হয়ে যায়। বাংলাদেশের বাইরে একজন ছাত্র অ্যাপলের ডিভাইসে ৫০ শতাংশ ছাড় পায় আর বাংলাদেশে অ্যাপলের কোনো ডিভাইস ঢুকলে জিনিসটির দাম বেড়ে বরং দ্বিগুণ হয়ে যায়!

সরকার ও বেসিস পাশে আছে

দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি। অন্যদিকে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা চার কোটি পেরিয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৯৫ শতাংশই মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকেন। সম্প্রতি পাওয়া তথ্য মতে, স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা গড়ে ন্যূনতম একটি অ্যাপ ব্যবহার করেন। প্রতিদিন দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় করেন অ্যাপস ব্যবহারে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা তাঁদের স্মার্টফোন ব্যবহারের ৮৬ শতাংশ সময় ব্যয় করেন অ্যাপসে। তাই দৈনন্দিন চাহিদানির্ভর অ্যাপস ডেভেলপ করতে পারলে বিলিয়ন ডলারের বাজারে বাংলাদেশের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়টি অনুধাবন করে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ দেশব্যাপী মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপমেন্ট-বিষয়ক প্রশিক্ষণ উন্নয়ন কর্মশালার আয়োজন করেছে, যার মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে অনেক ভালো ভালো অ্যাপস। এর মধ্যে থেকে ১০০টি অ্যাপসকে বাংলাদেশি অ্যাপস স্টোরে প্রকাশ করা হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি জাতীয় মোবাইল অ্যাপস সম্মেলনে সাতটি বিভাগে ১৪টি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন নির্মাতাদের পুরস্কৃত করা হয়।

এ ছাড়া দেশের তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) প্রতি মাসে মোবাইল মানডে কর্মসূচির আওতায় মোবাইল অ্যাপসবিষয়ক সেমিনার ও কর্মশালার আয়োজন করে আসছে। এর মাধ্যমে মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপমেন্ট সম্পর্কে সচেতনতার পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে। মোবাইল ও ওয়েব অ্যাপস ডেভেলপমেন্টকে এগিয়ে নিতে বেসিস প্রতিবছর আয়োজন করছে ‘কোড ওয়ারিয়র চ্যালেঞ্জ’ প্রতিযোগিতা, যার মাধ্যমে মোট আটটি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়কে পুরস্কৃত করা হয়। এ ছাড়া বেসিস ফ্রিল্যান্সার অ্যাওয়ার্ডের মাধ্যমেও মোবাইল অ্যাপস ডেভেলপার ও কম্পানিকে বিজয়ী করার মাধ্যমে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।

আছে সফলতার গল্পও

‘টিপ ট্যাপ অ্যান্ট’ গেইমটি খেলেননি এমন আইফোন ব্যবহারকারী খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। আঙুলে টিপে পিঁপড়া মারার মতো মজার কাহিনী নিয়ে তৈরি গেইমটির গ্রাফিকসের মান এত উন্নত যে একে সিলিকন ভ্যালির তৈরি গেইম বলেই মনে হয়। মজার খবর হচ্ছে, গেইমটি তৈরি করেছে দেশি প্রতিষ্ঠান রাইজ আপ ল্যাবস। বিশ্বের অনেক দেশেই এ গেইম জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছেছে। রাইজ আপ ল্যাবসের মতো বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন গেইমসহ মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করছে। দেশে তৈরি এ অ্যাপগুলো অ্যাপস স্টোরগুলোতে শীর্ষ দশে অবস্থান করছে বলে জানা গেছে। বর্তমানে প্রায় সব ধরনের মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টের কাজ হয় বাংলাদেশে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আইফোন, ব্ল্যাকবেরি, অ্যানড্রয়েড, পাম, জে২এমই প্রভৃতি। বাংলাদেশে অনেক সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নানা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিত পুরস্কৃত হচ্ছে। এ মুহূর্তে বাইরে থেকে যেসব অর্ডার আসছে, সেগুলোয় অ্যাপস ডেভেলপমেন্টের কাজই বেশি আসছে। তবে তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশে খুব কম মানুষকেই মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করতে দেখা যায়। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রচুর অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপার রয়েছে এবং এই বাজারে তাঁদের অবস্থান প্রতিনিয়ত শক্তিশালী হচ্ছে।

দেশি অ্যাপস স্টোর!

মোবাইল অ্যাপসের জনপ্রিয়তা এবং ব্যবহারিক বৃদ্ধির কারণে ইএটিএল প্রস্তুত করছে দেশীয় মোবাইল অ্যাপস বাজার। বাংলাদেশের মোবাইল অ্যাপস নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক বাজারের সম্পৃক্ত করতেই এ উদ্যোগ বলে জানা গেছে। ইএটিএল অ্যাপসের ওয়েবসাইট (www.eatlapps.com) থেকে আগ্রহীরা সহজে এসব অ্যাপ ডাউনলোড ও আপলোড করার সুযোগ পাচ্ছেন। ফ্রিল্যান্সার মোবাইল অ্যাপস নির্মাতাদের জন্য এ সাইটটি মার্কেটপ্লেস হিসেবে কাজ করছে। অভিজ্ঞরা তাদের তৈরি মোবাইল অ্যাপস এ সাইটের মাধ্যমে বিক্রি করতে পারছেন। এ ছাড়া সিম্ফনি, গ্রামীণফোনসহ বেশ কিছু মোবাইল ফোন অপারেটর ও ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস কম্পানির অ্যাপস স্টোর রয়েছে।

বিশ্ববাজার অনেক বড়!

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান গার্টনারের মতে, বর্তমানে মোবাইল অ্যাপসের বাজার প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারের। ২০২০ সাল নাগাদ তা হবে প্রায় ৫৪ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের।

মোবাইল গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ টু গাইডেন্সের মতে, অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টের এই যে বিশাল বাজার, তার ৬৬ শতাংশ কাজই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে! যুক্তরাষ্ট্রের ৭৫ শতাংশ ছোট খুচরা ব্যবসায়ী, ৭৭ শতাংশ বড় ব্যবসায়ী, ৭৫ শতাংশ ব্র্যান্ড, ৫৯ শতাংশ স্টোর এবং ৭৮ শতাংশ ফাস্ট ফুড শপ অ্যাপ ব্যবহার করে। ই-কমার্সে অ্যাপের ব্যবহার দেশের মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করার পাশাপাশি অনেক বেকারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। গত বছর ইবে অ্যাপের মাধ্যমে ২০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। তা ছাড়া অ্যাপের মাধ্যমে অ্যামাজনের বার্ষিক আয় পাঁচ বিলিয়নেরও বেশি। তাই বিলিয়ন ডলারের এই অ্যাপ-বাজারে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক প্রচারণা কৌশল ও ব্যবহারকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী ইউনিক অ্যাপ তৈরি করলে এই বাজার ধরতে তেমন বেগ পেতে হবে না।